• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :
নীলফামারীতে তিন দিনের ইজতেমা শুরু ভোটের দিনে লিফলেট বিতরণের দায়ে জামায়াত নেতার অর্থদন্ড নীলসাগর ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বন্ধ বিশ্ব স্ট্রোক দিবস: স্ট্রোকের ঝুঁকি, রিহ্যাবের সংকট ও পুনর্বাসনে সচেতনতার আহ্বান তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার হত্যা মামলায় মাগুরার সাবেক ওসি ও এসআই জেলহাজতে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে ৯ কর্মকর্তা প্রত্যাহার সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় জলঢাকা পৌরসভার সাবেক মেয়র গ্রেপ্তার রানীরবন্দরে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ব্যবসায়ী নিহত “ভালো থেকো আমার না হওয়া মহারানী”

সফল “জননী” তহুরা বেগম

Badarganj photo-02সারোয়ার আলম সুমন, বদরগঞ্জ(রংপুর): অভাব দৈন্যতাকে হার মানিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়েছে এমনি এক নিরক্ষর “জননী” তহুরা বেগম। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বদরগঞ্জ পৌরশহরের সাহাপুর ছকিমুদ্দিনের ডাঙ্গায় সামান্য একটু জায়গায় দুইটি টিনের চালার ঘর। একটি ঘরের ভিতরে স্বামী আমির আলীর ভাঙ্গা রিক্সা ভ্যান। আর একটি ঘরে তহুরা বেগম তার দিনমজুর স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করে।
তহুরার সপ্নের কথা
দরিদ্র দিনমজুর পরিবারে তহুরা বেগমের জন্ম। তার বাবার বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের পাঠানেরহাট বালাপাড়ায়। পড়া লেখার ইচ্ছা থাকলেও দিনমজুর পিতার সংসারে অভাব অনটনের কারনে লেখাপড়ার সৌভাগ্য হয়নি তহুরা বেগমের। দিনমজুর পিতার ঘরে অর্ধাহারে অনাহারে বড় হতে থাকেন তিনি। এক পর্যায়ে অল্প বয়সে তহুরার পিতা তার বিয়ে দেন একই এলাকার শাস্ত্রীপাড়া গ্রামের আর এক দিনমজুর আমির আলীর সাথে। নিজের নিরক্ষরতার ব্যার্থতা নিয়ে তহুরা বেগম ভবিষ্যতে তার সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখতে থাকেন।
তহুরার অভাব দৈন্যতার কথা
বিয়ের পর থেকে তার শ্বশুড় বাড়িতে দিনমজুর স্বামীর আয় রোজগার দিয়ে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছিল তহুরার। তার সংসারে শেষ সম্বল বলতে স্বামীর বাস্ত-ভিটার (৩ শতক) জমি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তহুরা বেগম তার স্বপ্নের কথা ভেবে স্বামীর বাস্ত-ভিটার ওই জমি দেবরদের ছেড়ে দিয়ে কাজের সন্ধানে স্বামীকে নিয়ে বদরগঞ্জ পৌরশহরের সাহাপুর এলাকায় চলে আসেন। সেখানেও এসে অভাব দৈন্যতার শিকার হন তারা। অন্যের ভিটা বাড়িতে থেকে তহুরার স্বামী আমির আলী দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। আর তহুরা অন্যের বাড়িতে ফাইফরমাস খাটেন। তাদের সংসারের জন্ম নেয় ২ ছেলে ১ মেয়ে। তহুরা বেগম তার সন্তানদের কিভাবে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করবে এ চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠে। এরপর বড় ছেলে আবু তাহেরকে বদরগঞ্জ ওয়ারেছিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। ছেলের টিউশনির খরচ যোগাতে শিক্ষকদের বাসা-বাড়িতে কাজ করতেন তহুরা বেগম। এর বিনিময়ে তার ছেলে আবু তাহেরকে পড়াতেন ওই শিক্ষকরা। তহুরা বেগম সন্তাদের লেখা পড়া খরচ যোগাতে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাতে সেলাই ফোঁড়াইয়ের কাজ করতেন। দিনে শিক্ষার্থীদের মেসে রান্নাবান্নার কাজ করতেন। এছাড়াও তহুরা একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে স্বামীকে ২ হাজার ৩ শত টাকায় একটি রিক্সাভ্যান কিনে দেন। স্বামীর ওই রিক্সাভ্যানের রোজগারের টাকা ও তহুরার দিনে রাতে পরিশ্রমের আয় দিয়ে এভাবেই সন্তাদের লেখাপড়া খরচ চালাতেন। এরপরও তহুরা বেগম সংসারের ও সন্তাদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমসিম খাচ্ছিল। এমনকি  আত্বীয়-স্বজনদের কাছে ধার কর্জ ও সাহায্য নিয়ে ছেলের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পুরণ করান। গত ২০০২ সালে তার বড় ছেলে আবু তাহের এ গ্রেড পেয়ে এসএসসি পাস করে। এরপর বদরগঞ্জ ডিগ্রী কলেজে আবু তাহেরকে ভর্তি করে। পরে ওই কলেজে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসিতে প্রথম বিভাগে পাস করে আবু তাহের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে ভর্তি হয়। সেখানে এমএ(সম্মান) পাস করার পর ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করেন।
তহুরার সাফল্য
তহুরা বেগম তার জীবনের প্রতিটি ঘন্টায়, প্রতিদিনে অভাব দৈন্যতার সাথে যুদ্ধ করে তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। কষ্টজয়ী তহুরার বড় ছেলে আবুতাহের বর্তমানে একটি জেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে আছেন। গত ২৭ জানুয়ারী রংপুর বিভাগে ৮ জেলায় ৫০ নারীর মধ্যে থেকে জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রমের আওতায় সফল জননী’ হিসাবে তহুরা বেগম পদক লাভ করেন। তার আর এক ছেলে মোত্তালেব হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। মেয়ে আয়শা সিদ্দিকা বদরগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেনীর শিক্ষার্থী। তহুরা বেগম তার অভাব দৈন্যতার জীবনের ঘটনাবলী বলতে বলতে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তার এ আনন্দ অশ্রু দেখে অনেকের চোখে পানি এসে যায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ